ভারতে মুর্শিদাবাদে বিরল শিক্ষা ও সবুজ সেনা সম্মান

Please share this post
ভারতে মুর্শিদাবাদে বিরল শিক্ষা ও সবুজ সেনা সম্মান
 [ Murshidabad, India, exceptional world Education and Green Knight Honour , a desperate column by Ridendick Mitro ]
               
            ঋদেনদিক মিত্রো
শুরু করা যাক এইভাবে। তবে ধৈর্য্য ধরে পড়ে যাবেন,  দেখবেন কী খুঁজে পান। পাবেন ভারতে নতুন শিক্ষা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হোলো মুর্শিদাবাদে,  সবুজ সেনা সম্মান কী, পৃথিবীর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা সহ সব জায়গায় শিক্ষাপদ্ধতির চেয়ে মুর্শিদাবাদে কলকাতা থেকে আসা সমর্পিতা নামের এক নারীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষা পদ্ধতি কি মূল্যবান নয়? আর, নবাব সিরাজ, রাজা শশাংক,  রাজা হর্ষবর্ধন। এই তিন শাশকের একটু পরিচয় মনে করিয়ে দিয়ে পরপর যাবো বিষয়ের বিস্তারে। তা না হলে কোনটার সাথে কোনটার কী সম্পর্ক সেটা বুঝতে অসুবিধে হবে। পড়ার মজা যারা বোঝে তারাই পাঠক।
নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে সকলেই জানি, কারন তাঁকে অনৈতিক ভাবে পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রতিনিধি রবার্ট ক্লাইভ বাংলায় ইংরেজদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেন। এইভাবে ভারতে প্রথম ইংরেজের অধিকার স্বাধীন ভাবে অধিকার লাভ করে। ১৭৬৪ সালে বক্সার যুদ্ধে ইংরেজ জয়ী হলে তখন বাকি ভারতের দেওয়ানী লাভ করে।
১৭৫৭ খৃিষ্টাব্দে ২৩ জুন এই যুদ্ধ হয় এক লাখ আম গাছে ছিল এমন বিরাট প্রান্তর — পলাসিতে। মাত্র ২৫ বছরের চেয়ে কম বয়সে তিনি মারা যান। সেই কাহিনির বিস্তারে আর যাচ্ছি না। তবে মাত্র ১৪ মাস ক্ষমতায় ছিলেন,  এবং ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই তিনি ইংরেজদের কৌশল নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।এবং সেই কারনে নানা ব্যাবস্থা নেবার চেষ্টা করেন।
যুবক সিরাজ ভারতে প্রথম বুঝেছিলেন যে, ইংরেজজাতি ব্যাবসা করার কৌশলে ভারতে ঢুকে সব গ্রাস করবে। তাই তিনি কলকাতায় কাউকে না জানিয়ে ইংরেজের তৈরি দূর্গ আক্রমন করেন। সেই দূর্গ পরে জি-পি-ও বা জেনারেল পোষ্ট অফিস হয়। বর্তমান ধর্মতলা এলাকায় এর অবস্থান। যুবক সিরাজের এই বিচক্ষনতা ও সাহস দেখে বুদ্ধিমান ক্লাইভ অন্য অংক কষে নেন। কারন, তিনি জানতেন  সিরাজ থাকলে ভারতে ইংরেজের প্রবেশ কোনোদিন সম্ভব নাও হতে পারে। নবাব সিরাজের প্রাসাদ ছিল ভাগীরথীর পশ্চিমে হীরাঝিলে। এবং চিরনিদ্রায় শায়িত স্থানীয় খোসবাগে। এইসব ইতিহাস নিয়ে অনেক আগে থেকেই কাজ হচ্ছিলো নানা গবেষকদের দ্বারা। ২০১৭ সালে কলকাতা থেকে এক বিদুষী নারী সমর্পিতা এসে নবাবের ইতিহাসকে নিয়ে নবজাগরন নিয়ে আসেন। সেগুলি আমরা সব জানি আধুনিক সংবাদমাধ্যমের প্রেক্ষাপটে। মুদ্রিত ও ইলেক্ট্রিক সংবাদমাধ্যমের দৌলতে। এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ইতিহাসের তথ্যের প্তেক্ষাপটে এখানে এটা না জানালে ইতিহাসের পাতাকে বিভ্রান্ত করা হবে, সেটা হোলো — গবেষক- সাংবাদিক মানস সিনহা, তাঁর ইউটুব চ্যানেল Manas Bangla –তে “লুৎফুন্নিসার কি পুনর্জন্ম হয়েছিল- Was Lutfunnisa reborn” youtube-এ প্রথম সমর্পিতার একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে রাতারাতি লাখ-লাখ মানুষের কাছে। তারপর এই ইতিহাস নিয়ে পরপর শুরু হয় বিপ্লব।সেগুলি এই চ্যানেল সহ নানা চ্যানেলে বেরুতে থাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করে। বিভিন্ন পরিশ্রমি সাহসি মুদ্রিত পত্রিকার সাংবাদিক ও অন্য সব মাধ্যমের সাংবাদিকদের সহযোযীতায় ও জেলার অনেক মানুুুষদের সহযোগীতায় নবাব সিরাজুুুদ্দৌলার ইতিহাস রক্ষা করার সমর্থনে আন্দোলন চলতে থাকে। তার ফলে ৫ ডিসেম্বর ২০২১ সালে হয় বহু ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলন। এবং ২৩শে জুন ২০২২ খৃিষ্টাব্দে  পলাসির যুদ্ধের ২৬৫ তম বর্ষ পালিত হয় শহীদ বেদীর উন্মোচনের মধ্য দিয়ে। এই কারনে এখানে আসেন অনেক সাংবাদিক, সরকারি পদাধিকারি ব্যাক্তি, বাংলাদেশ থেকে আসা নবাব সিরাজুদ্দৌলার নবম বংশধর সৈয়দা মাহমুদা এবং ভারতসরকার কতৃক এখোনো স্বীকৃত নবাব পরিবারের ” নবাব অব মুর্শিদাবাদ” এর ভাই ছোটে নবাব রেজা আলি মির্জা।
ইতিহাসের কারনে বলতেই হবে যে, নবাবের প্রসাদের ভগ্নদশাময় হীরাঝিলের বনের ভিতর প্রয়োজনীয় পরিমান জমি দান করেন জমির মালিকপক্ষ উজ্জ্বল সরকার, নিখিল সরকার ও তাঁদের মা। গ্রহীতা ” নবাব সিরাজুদ্দৌলা স্মৃতি সুরক্ষা ট্রাস্ট “। ট্রাস্ট এর কর্নধার সেই সমর্পিতা। উদ্দেশ্য শহীদবেদী নির্মান,  সভা, ও প্রাসংগিক প্রয়োজনে ব্যাবহার। আইনীয় পদ্ধতিতে ৯৯ বছরের লিজে দেওয়া হয়। এইসব ক্ষেত্রে যেমনটা হয়ে থাকে। এইসব সহায়ক ঘটনা সমর্পিতার চিন্তার ও কাজের উল্লেখযোগ্যতাকে প্রমান করে। তাঁকে হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলনে সহায়তা করেছেন ” হীরাঝিল বাঁচাও কমিটি”, সহ নানা সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যাক্তি। ভারতীয় প্রত্নতত্ব বিভাগ। এবং তাদের এই আন্দোলন কেবল নবাবের ইতিহাস রক্ষার বিষয়ে নয়, নদীর পাশের গ্রামগুলি নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে, এইসব রক্ষা করার জন্যও এই আন্দোলন। রাজ্য সরকার, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, প্রত্নতত্ব বিভাগ সহ আরো নানা দপ্তরে এঁদের আবেদন গেছে। সারা রাজ্যে তথা ভারতে এসেছে এর এক নবজাগরন। মুক্ত চিন্তা শিক্ষার নবজাগরন।যার মানে বহু দিক ভেবেই আমাদের কাজ করা দরকার। আসলে এই পদ্ধতিগুলোর সংগে আছে মুক্ত চিন্তা শিক্ষার বা Free thought education এর স্বাভাবিকতা। তাই এইসব কাহিনির উল্লেখ করা দরকার।
২০১৭ সালে উনি এখানে আসার পর থেকে কিছু দিন পরে শুরু হয়েছিল খোসবাগে সমর্পিতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ” নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ”। এই স্কুল নিয়েই লিখতে গিয়ে এইসব তথ্য কিছু দিতে হচ্ছে,কারন, তা না হলে পাঠক এই নিবন্ধের সঠিক দিশা পাবেন না। সেই ভাবেই যতটা পারি গুছিয়ে বলছি। কারন, বিষয়টি সেই রকম বহুমুখি বিষয়।
মাঠে, রাস্তায়, এই মুক্ত চিন্তা শিক্ষার স্কুল চলতে থাকে। বিদেশী ভাষা শিক্ষা,  সঠিকভাবে পাঠ্যপুস্তক পড়ার পদ্ধতি, ছবি আঁকা, ক্যারাটে, সংগীত, আবৃতি, নৃত্যকলা, বকৃতা দেওয়া দক্ষতা, নিজেকে ও সমাজকে সুস্থ রাখার পদ্ধতি, কোনো বিষয়কে অনুভব করা ও করানোর দক্ষতা, সঠিকভাবে হাঁটা, সঠিক পদ্ধতিতে কথা বলা, যেকোনো বিষয়ের গভীরে ঢুকে যাবার দক্ষতা, সব সময় সব বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা ও পন্থা, মানুষ ও সব জীবজগৎ সহ প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, — এইরকম নানা বিষয়ে নানা আংগিকে গড়ে তোলা। আরো নানান বিষয় এখানে যোগ হচ্ছে ও হবে। কারন, জ্ঞান ও চিন্তা কোনো নির্দিষ্ট বিষয় ও পরিধির মধ্যে বন্দী থাকে না এটাই এক শিক্ষা প্রনালী বিশ্বাস করে। কেক তৈরির পদ্ধতিও এখানে শেখানো হতে পারে, পাশাপাশি আবার ঘাস কাটার পদ্ধতিও শেখানো হতে পারে। নিজেকে নানা জ্ঞান ও দক্ষতায় শিক্ষিত করার প্রয়াস থাকলে শিশু,  বড়৷ সকলেই সহজ ও সাবলিল জীবন যাপনে অভ্যস্ত রাখবে। তখন, পরিবার থেকে ও সমাজ থেকে ক্ষুদ্র স্বার্থেপরতার প্রবনতা বেরিয়ে যাবে। আবার বলি কিছু বিটকেল মানুষ হয়তো তাদের শয়তানি থেকে সরবে না। কিন্তু, বেশিরভাগ মানুষ আস্থাশীল হবে সততার প্রতি, যখন তারা মুক্ত জ্ঞান চর্চার অভ্যেসে প্রবেশ করবে।  এই শিক্ষা প্রনালী বিশ্বাস করে প্রতিটি মানুষের মধ্যে মনিষী ও বিদুষী সত্বা লুকিয়ে আছে। মুক্ত চিন্তার শিক্ষায় তার প্রকাশ ঘটে,  কারন এর দ্বারা এই ধরনের শিক্ষার্থীরা একে অপরের প্রতি আস্থাশীল হয়। মানুষের বিচিত্র ইচ্ছে, কখনো সে কাউকে অকারন আঘাত করতেই পারে, কিন্তু, সামগ্রিকভাবে আসবে সুস্থ গতি। আর এই সুস্থ গতি না এলে সমাজ, দেশ, পৃথিবী কখনো বিপদ মুক্ত হতে পারবে না। সেই প্রমান আমরা পাচ্ছি প্রতি দিন প্রতি রাত্রি।
স্কুলে রচনা লেখা হয়, ” জীবনের লক্ষ্য “। কে কী হয়ে অনেক টাকা আয় করবে আর লোকের সেলাম নেবে, এই নিয়ে সকলে রচনা লেখে। কিন্তু সেইগুলি হয়ে যে পরিবার, সমাজ ও বিশ্বের কোনো লাভ হয় না, তার প্রমান হোলো আমরা সেই লক্ষ্য পুরন করার পরেও পরিবারে, সমাজে নানা ভাবে বিপন্ন হই। পরিবার,  সমাজ ও পৃথিবীকে নানাভাবে বিদ্ধস্ত করি।
এখানে সেখানে মাটির ওপর বসে, বা কোনো ঘরের দাওয়ায় বসে এই  শিক্ষালয় চলতে থাকে সকলের উৎসাহে ও আনন্দে। শিক্ষার প্রনালী এমনি যে, সেটা ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মুগ্ধ করে। রোদ, বৃষ্টির মধ্যেই চলে পড়াশোনার মুক্ত আনন্দ। এই ঘটনা মুগ্ধ করে “খোসবাগ পল্লি উন্নয়ন সমিতি”-কে। এই ক্লাবের থেকে খেলোয়াড় মোহনবাহানেও খেলছে। এইসব নানা কারনে খুব পরিচিত এই ক্লাব।  বারো বিঘে জমির এলাকার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাব তখন তাঁদের ক্লাবের জমির মধ্যে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্কুলবাড়ি নির্মান শুরু করে।  পরপর কোনো-কোনো সংস্থা এগিয়ে আসে নিজেদের সামর্থ মত উৎসাহ ও সহযোগীতা দিতে। আমি বোঝাতে চাই, একটি কাজের ধারা কতটা মুগ্ধ করেছে হাজার-হাজার মানুষকে। সব বয়সের নারী ও পুরুষকে। তাই এখানে প্রতিটি কথাই আবশ্যিক। এবং আরো দেখানো হচ্ছে, এই দেশের মানুষের মন উপযুক্ত বিশ্বাস পেলে নরম হতে পারে। কিছু ব্যাতিক্রম বাদ দিলে এটা বলতেই হবে ভারতীয়রা যে উন্নত বিষয়ের সমর্থক, সেটাই প্রমান করছে এই ঘটনাগুলি। এর মধ্যে অতিরিক্ত কিছু বললাম কিনা আপনি বিচার করুন।
এবার আসবো রাজা শশাংককে নিয়ে।
গৌড়রাজ রাজা শশাংকদেব বাংলার প্রথম স্বাধীন নৃপতি,  অনেক ক্ষুদ্র রাজ্যকে এক করে একটি সর্বভৌম বৃহৎ রাজ্য প্রতিষ্ঠা  করেন খৃিষ্টিয় ৭ম শতাব্দিতে, আন্দাজ ৬০০-৬২৫ সাল অবধি। আজোবধি এই সময়টা জানা যায়।  রাজধানী ছিলো বর্তমান মুর্শিদাবাদের কর্নসুবর্ণ। স্থানটি রাজবাড়িভাংগার নিকটে চিরুটি রেলস্টেশনে নামতে হয়। জানা যায়,  তিনি নিজের যোগ্যতায় রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
উত্তর ভারতের সম্রাট রাজা হর্ষবর্ধনের জীবনকাল ৫৯০-৬৪৭। মতান্তরে ৬৪৮। ৬০৬ থেকে তাঁর শাশনকাল। পিতা ছিলেন সম্রাট। সেই সূত্রে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি রাজা হন। কিন্তু যোগ্যতা ও মানবতায় তিনি কিংবদন্তি। আমরা যেটা কুম্ভমেলা জানি, সেটা তাঁর প্রতিষ্ঠিত। প্রতি বছর তিনি এই মেলাতে গিয়ে রাজকোষ শুন্য করে দান করে ভিখারি হয়ে প্রাসাদে ফিরতেন।  তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রজার দ্বারা উৎপাদিত সম্পদ প্রজারা ভোগ করবে। এই রকম মহান রাজা ভারতে অনেকে ছিলেন। কারন, এটাই সত্যি যে, ভারতে অনেক জ্ঞানের আলো ও চিন্তার বিচিত্র পথ যুগে-যুগে তৈরি হয়েছে। তার মধ্যদিয়ে অনেক দূর্ঘটনাও ঘটেছে অনেকের শাশনে। কিন্তু, এখানে নিবন্ধের শিরোনামের সাথে প্রাসংগিক বিষয় ছাড়া আর বেশি কিছু বলা যাবে না।
শুরু যেখান থেকেই করি,  চলতে-চলতে যাবো অনেক দূরে। কারন,  আমরা শুরু করছি এখন থেকে পিছনে হাজার-হাজার বছরের পথে। ইতিহাসের পথ বিচিত্র স্বাদে ভরা, সেই বিচিত্র স্বাদ নিয়ে আমরা এগোবো। দুনিয়াতে অনেক খাবার আছে। প্রতিটি খাবারের এক একটি স্বাদ আলাদা। কিন্তু, ইতিহাস এমন জিনিস,  তার মধ্যে থাকে সব খাবারের স্বাদ। কারন,  সেটাই হোলো ইতিহাস, যার ভিতরে থাকে সব রকম জ্ঞানের স্বাদ।  যাঁরা বলেন ইতিহাস আবার একটা পড়ার বিষয় নাকি, সহজে মুখস্ত করে পরিক্ষায় লিখে দেওয়া যায়।
আমি এইসব আজব নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বলি যে, আপনাদের সব শিক্ষা ও ডিগ্রিগুলি বৃথা। কারন, কোনো বিষয়টাই আপনারা সঠিক গভিরতায় পড়েন না।তাই এমন ভাষা শুনি, এবং আপনাদের ছেলে মেয়েদের এই ভুল ভাবনায় ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের চিন্তার স্তরকে অকেজো করে দেন।
কেন বলছি এই কথাগুলো,  শুনুন। ইতিহাস থেকেই একটি বিষয় টেনে নিয়ে যাবো কোথায়, চলুন আমার সাথে। তবে সত্য বড় কঠিন, তার চেয়ে বড় হোলো সত্যকে অনুভব করার সাহস।
“সবুজ সেনা সম্মান ” বলে একটি পুরস্কার বা সম্মান দেওয়া হচ্ছে। ভারতের বাংলায় মুর্শিদাবাদ থেকে। একাধিক দেশের গুণিদের দেওয়া হয়। এটির নাম শুনে ভাবছেন এটা কি ছেলে মেয়েদের খেলাধুলার জন্য কোনো পুরস্কার!  না-হলে এমন নাম কেন!
এবার এই নিয়ে বলতে গেলে বলি, এই নিবন্ধে আমি এমন কিছু বলবো যেটা সবাইকে ভাবাবে। এটি একটি আন্তর্জাতিক মর্যাদার পুরষ্কার বা সম্মান। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হয়। কারন, এটি সব বয়সের ছাত্রছাত্রীদের পরিনত নাগরিক হয়ে ওঠার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকক্ষ।
আসুন, সহজভাবে বিষয়টিতে প্রবেশ করা যাক।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ” নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ”। ভারতের পশ্চিমবংগে মুর্শিদাবাদে। খোসবাগে নবাব সিরাজের কবর আছে। আর,  এখানে নবাব জ্যোৎনায় ঘুরে বেড়ান,  যাদের দেখবার চোখ আছে তারা দেখে, সকলে সবটা দেখতে পায় না বলেই সকলের সুখ শান্তি ও দুঃখ একরকম হয় না।
এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর “সবুজ সেনা সম্মান”  দেওয়া হয় দেশে-বিদেশে নানা গুণীজনদের। আরো নানা নামের পুরষ্কার বা সম্মান হয়তো রয়েছে বা পরে শুরু হবে, কিন্তু এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে কিছু বলছি। যতটা আমি জেনেছি ও অনুভব করেছি।কারন, আমার চিন্তাগুলি এই প্রতিষ্ঠান থেকে আসছে।
আগে প্রশ্ন চলে আসে, কেনো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম “নবাব” নাম দিয়ে শুরু হবে। একজন ভিখারির নামে হোলে সেটা মহৎ কাজ হোতো।
তাহলে সেটা হতে পারতো ” ভিখারি ননীচন্দ্র দাস মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ” বা ” ভিখারি সিরাজউদ্দিন হাসান মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ!” জানিনা, এইসব নাম ওখানে কারোর নাম আছে কিনা, যদি থাকে সেটা জানি না, আমি বলছি একটা বিষয় বুঝিয়ে বলার জন্য। তাই,  এইসব নামে কারোর নাম থেকে থাকলে সেটার সাথে এই লেখার কোনো যোগ নেই।
এখন কথা হোলো, কোনো ভিখারির নামে এই ইস্কুলের নাম হলে সব ভিখারি-দরদীরাই বলতেন, ” ভিখারির নামে ইস্কুল, এইখানে ছেলে মেয়েদের পড়িয়ে কি ভিখারি মানসিকতা বানাবো। যত্তসব! “
এইটা আরো প্রসারিত করে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিন আমাকে।
আচ্ছা, যদি কোনো ভিখারির নামে এই ইস্কুল হোতো, তাহলে প্রশ্ন আসে, ভিখারি কে? আমরা সকলেই ভিখারি, কেউ টাকার ভিখারি, কেউ জমির ভিখারি, কেউ আইনের কাছে ভিখারি, কেউ খাদ্যের জন্য ভিখারি, কেউ খারাপ পরীক্ষা দিয়ে পাস করার জন্য ভিখারি, কেউ বাসস্থান পাবার জন্য ভিখারি, কেউ পোষাক পাবার জন্য ভিখারি, কেউ রোগ সারানোর জন্য ডাক্তারের কাছে ভিখারি, কেউ আয়নার সামনে নিজের প্রতিবিম্বের কাছে সৌন্দর্য ভিক্ষা করে ভিখারি, কেউ কিছু হারানো জিনিস খুঁজতে চেয়ে ভিখারি, কেউ ক্ষমতা লাভের জন্য বা ক্ষমতা রক্ষার জন্য ভিখারি। ভিখারি তাহলে সকলেই। তাহলে যেটা সকলেই আছি সেটার কোনো উল্লেখযোগ্যতা নেই। তাই ভিখারি সকলে, কিন্তু নবাব সকলে নয়। তাই “নবাব” এর নামেই ইস্কুলের নাম হওয়া মঞ্জুর করা যায়।
কেউ এবার বলবেন, ” আরে লেখক, আমরা কি ওই ভিখারির কথা বলছি, আমরা বলছি পথে দাঁড়িয়ে যারা পয়সা ভিক্ষা করে বা প্রতি বাড়িতে গিয়ে যারা চাল বা পয়সা চায়। তাদের কথা বলছি। তাদের কারোর নামে ইস্কুলটার নাম হলে অনেক মহৎ কাজ হোতো। কারন, ভিখারি তো মহান! “
তাহলে আমার জবাব হোলো, ” ভিখারি মানে মহান এটা কে  বললো? ভিখারি হয় সেই,  যে নিজের জেদ বা ভুলের কারনে বা দূর্ঘটনার কারনে সব সম্পদ হারায়। তাহলে সম্পদ হারানো কি মহত্বের প্রমান? তাহলে জগতের সব পরাজিত জুয়াড়িরা মহৎ।
আসলে সমাজে অনেক চলে আসা ভুল ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকি, কারন আমাদের মুক্ত চিন্তার শিক্ষা নেই। তাই এই যে-কথাগুলি বললাম, এগুলি আমাদের প্রথাগত শিক্ষার আড়ালে ছিলো।
কেউ বলবেন, ” নবাব যাঁরা তাঁদের কি কোনো দোষ নেই, সব দোষ ও বুদ্ধিহীনতা কি ভিখারির?”
যেকোনো অসহায় ভিখারিকে সাহায্য করা উচিত এবং এটা একটি মহৎ কাজ, মনের গোপন শান্তি, এই সত্য মেনেও বলছি যে,  যার বেশি দোষ, সেই ভিখারি,  যার কম দোষ সেই তো নবাব হয়।
এবারে আমাকে সকলেই ধাক্কা দিয়ে বলবেন, ” এইসব কথা সাহিত্যের অপমান। ভিখারির দোষ বেশি, নবাবের দোষ কম —– এই কথা একরকম ধনী শ্রেনীর অহংকারী ঘোষনা। “
আমি এর উত্তরে বলি যে, এই কথা আমার দাম্ভিক আভিজাত্যর মতামত নয়, বরং এটি চরম সত্য। কারন, যে নিজের বুদ্ধিকে ও সাহসকে নেতিয়ে রাখে সেই হয় ভিখারি। কারোর জীবনে কিছু ব্যাতিক্রমী ঘটনা বাদ দিলে বাকি ক্ষেত্রে দেখা যায় — কোনো মানুষ ভিখারি হয় নিজের সম্মান, বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান ও মানুষ চেনার ক্ষম্লতাকে অস্বীকার করে। সে যখন ভিখারি হবার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলো তখন তাকে কেউ দিয়েছিল সঠিক যুক্তি, সে শোনেনি, তাই সে ভিখারি হয়েছে। এবং সে এই ভাবেই দিন কাটাচ্ছে কারন এই পথ থেকে বেরুতে চায় না বা কোনো পথ পাচ্ছে না। তাহলে যে-ব্যাক্তি সঠিক পথ পাবার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা দেখায় বা সঠিক পথ পাচ্ছে না কোনো কারনে, সে কী করে অনুসরণ-যোগ্য হতে পারে!
কিন্তু যিনি নবাব, তাঁর অনেক খারাপ গুণ থাকা স্বাভাবিক,  কারন বংশানুক্রমিক ভোগ বিলাসের অভ্যেস মানুষকে নষ্ট করে নানাভাবে, তাই এইসব না থাকলেই ভালো হোতো, সব নবাব ও মানুষের ক্ষেত্রে এটা সত্য, কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্য — যিনি নবাব তিনি কয়েকটি গুণে গুণী৷ যেমন,  তিনি আত্মবিশ্বাসী,  দেশ চালানোয় কম বেশি বিচক্ষন, সৌন্দর্য্য নিয়ে খুঁতখুতে, জ্ঞানীর পৃষ্ঠপোষক, প্রখর বিচারের অনুভুতি সম্পন্ন, কাছ ও দুরের শত্রু নিয়ে সচেতন, যুদ্ধ করায় ও বহু মানুষকে একত্র করার ক্ষেত্রে দক্ষ, নিজের বিষয় বুঝিয়ে বলতে দক্ষ, শত্রুকে ঠেকানোর জন্য যুদ্ধ শিখেছেন, নিজের অস্তিত্ব ও রাজ্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বেপরোয়া সাহসী, অতিথি পরায়ন।
এতগুলি গুণ নিয়ে একজন নবাব হন। আর ভিখারি হয় এইসব গুণগুলির অভাবে। তাহলে কার অধিকার বেশি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামের সাথে তার নাম যোগ হবার ক্ষেত্রে?
কেউ বলবেন, ” আচ্ছা,  ভিখারি না হোক, একজন শ্রমিকের নামে তো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম হতে পারে।”
হ্যাঁ, হতে পারে, যেকোনো সৎ মানুষের নাম দিয়ে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম হতে পারে। আর একান্তই ব্যাতিক্রমি ঘটনা না ঘটলে শ্রমিক মানেই প্রায় সৎ। কিন্তু, শ্রম দিয়ে তো পৃথিবী, আর সব জীবের মধ্যে,  এমন কী গাছের ম্লধ্যেও শ্রমিক সত্বা বাস করে। তাই শ্রমিক কোনো শ্রেনী নয়, ব্যাক্তিও নয়, শ্রমিক হোলো এই মহাবিশ্বের কর্মকান্ডের ধারা।
কেউ বলবেন, ” এতদূর চিন্তায় না গিয়ে সহজ নিয়মে ভেবে নিয়ে,  একজনশ্রমিকের নামে তো একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম হতে পারে। “
তার উত্তরে বলি যে, সেটা হতে পারে যদি তিনি বিরল চেষ্টা দিয়ে নিজের পরিবার ছাড়া অন্য কাউকে শিক্ষিত করতে পারেন, বা শ্রমের দ্বারা প্রাপ্ত টাকা দিয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিছুটা হলেও গড়েছেন। বা নিজে শ্রমিক হয়েও শিক্ষিত হয়ে সমাজের বা প্রকৃতির কোনো কাজ করেছেন। কিন্তু, এমনি কোনো শ্রমিকের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের  নামে হতে পারে না,  কারন সে শ্রমিক হয়ে আছে নিজের বিপন্নতার কারনে, নিজের ইচ্ছাতে সে শ্রমিক হয় নি। কিন্তু, শ্রমিকগন খুব সরল হন, তাই তাঁদেরকে শ্রদ্ধা করা উচিত এই কারনে যে এঁরা চরম অভাবেও চেষ্টা করেন কষ্টে বাঁচতে। কিন্তু এই সত্য সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। তাই যদি হোতো,  তাহলে একজন শ্রমিক শিক্ষিত হয়ে উচ্চ পদ পেলে ঘুষ নেয় কেন, সাহসী হবার পদ পেলেও চাটুকার হয় কেন, ধনী হলে তারপর তার শ্রমিক ভাইদের ভুলে যায় কেন?
তবে,  আমরা ছোটবেলা যেসব শ্রমিকদের দেখেছি, আমার মনে হয় তাঁরা পৃথিবীর রাজদূত, আমার সকল জীবন তাঁদের পায়ে  নত। এখনও অনেক শ্রমিক আছেন, যাঁরা নিজেরাই এক একজন আত্মজ্ঞান, সীমাহীন নির্লোভতা, এইসব নিয়ে এক একজন সভ্যতার মহাসৈনিক। এগুলি আলাদা ব্যাখ্যা।
কিন্তু, “নবাব”  শব্দটি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিশেষ মাত্রায় মানসিক ক্ষমতা তৈৈরি করে,  যেটা অন্য কোনো পেশার নামের সাথে করে না। তা বলে কি দুনিয়ার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির নাম কোনো না কোনো নবাবের নামে হবে? কখোনোই নয়। সেই কথা সমর্পিতাও বিশ্বাস করেন না, কারন তিনি মুক্ত চিন্তার শিক্ষায় বিশ্বাসী।
তাই, যেমন তিনি চান না সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম হোক কোনো না কোনো নবাবের নামে, তেমনি তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ” নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ”।  কারন, এর পেছনে যুক্তি হোলো, নবাব সিরাজুদ্দৌলার নাম থেকে ভারতের পরাধীনতার শুরু ব্যাপক ধারায়। তার ফলে ১৯০ বছরের ইংরেজ শাশনে ভারত হোলো বিপন্ন। আমরা স্বাধীনতা পেলাম কত বছরের পর। যদি বলি নেতাজীর দ্বারা ১৯৪৫ সালে জাপানে ভারতের স্বাধীনতা আসে এবং ৫ বা ৬ টি বিদেশী রাষ্ট্র দ্বারা সমর্থন লাভ করে সেই স্বাধীনতা, তাহলেও প্রায় ১৯০ বছর পরাধীন, আবার যদি  জওহরলাল নেহেরু দ্বারা ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা  প্রাপ্তিকে স্বাধীনতা প্রাপ্তি হিসেবে ধরি তাহলেও একদম ১৯০ বছর পরাধীনতা বোঝায়।
নবাব সিরাজ এমন একটি মূল কেন্দ্র, যেখান থেকে ভারতের ইতিহাসের আগের ও পরের ইতিহাসকে নিয়ে বিচার করতে সুবিধে হয়।
একই সাথে নবাব সিরাজের ভিতরে এমন কিছু বিশেষ গুণ ছিলো সেই সব গুণ আমাদের মুগ্ধ করে। যেসব দোষ ছিলো সেগুলি তাঁর গুরুজনদের বয়ে আসা ভুল চিন্তা ও অসংলগ্নতা। যেমন আমরা পরিবারের মধ্যে থেকে অনেক ভুল জ্ঞান ও বদঅভ্যেস শিখে সেগুলিকে ভাবি পারিবারিক আভিজাত্যের ধারা।  পরে সেগুলি নিজের ভিতরে বুঝতে পেরে ধিক্কার দিই নিজেকে। গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নষ্ট হয় সেই গুরুজনদের প্রতি যাঁরা আমাদের শিখিয়ে ছিলেন বোকা চালাকি করার অভ্যেস ও অসহায়ের প্রতি কৌশলের দূর্ব্যবহার।
নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ –, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেই জন্য শুরু করেছে মুক্ত চিন্তার শিক্ষা ধারা, যা দিয়ে চেনানো হয় নিজের ভুল ও অন্যের ভুল কোথায় লুকিয়ে থাকে। এর স্বাভাবিক শিক্ষাপদ্ধতি সেই পথেই হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। আমি নিজেকে না চিনলে অন্যকে চিনবো কী করে!
এবার আসি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ও ” সবুজ সেনা সম্মান ” নিয়ে আরো কিছু কথা। তা না হলে বিষয়টা সম্পূর্ণ করা যাবে না।
এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জেনারেল হলেন সমর্পিতা, কলকাতার বিশিষ্ট অভিনেত্রী,  “কলকাতা দূরদর্শন ” এর একজন সংবাদ-পাঠিকা, ইতিহাস গবেষিকা, ভারতে তথা বিশ্বে ইতিহাস সংরক্ষনের ওপর আন্দোলনের পৃথিবী-চমকে দেওয়া বিপ্লবি ও সংগঠক, সুরকার, গায়িকা, লেখিকা, সমাজ সংস্কারক, ক্লাসিক ফিল্ম ডিরেক্টর, দুঃসা্হসী বক্তা, এবং বিশ্বের এক আধুনিকতম দূর্লভ পদ্ধতির শিক্ষাবীদ।
ইনি কাজ করার প্রয়োজনীয়তা  অনুভব করেন দূর্লভ চিন্তাশীল মানুষদের সহযোগীতায়। একই সাথে গুরুত্ব দেন নামখ্যাতিহীন সাধারন পরিচয়ের  কোনো-কোনো নাগরিকের চিন্তা ও পরিকল্পনায়। ইনি বিশ্বাস করেন যে, উন্নত চিন্তা ও পদ্ধতি কখন কার মাথায় আসে বা লুকিয়ে থাকে সেটা বাইরের পদ, একাডেমিক শিক্ষা, বয়স,  এইসব দেখে বুঝতে পারা যায় না। এই ভাবনা ভাবতে পারেন বলেই ইনি নিরপেক্ষ চিন্তা ও মুক্ত ভাবনার শিক্ষা ধারা চালু করতে পেরেছেন। যে-ধরনের শিক্ষা সামগ্রিক ভাবে চালু হলে দেশ রাতারাতি সুস্থ চিন্তার পক্ষপাতহীন মনের উন্নত বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন বহু বিদ্যায় পারদর্শি নাগরিক হয়ে উঠবে। উদ্দেশ্যহীন ভোগী ও লোভী চরিত্রের হবে না।
এখানে সবাইকে ক্ষুদ্র স্বার্থের আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের করে একজন মুক্ত মানসিকতার নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
ভেবে দেখুন, সংসার মানে চার দেওয়ালের একটা পরিসরে বেঁচে থাকা —  কতকগুলি এক মাত্রিক পদ্ধতি দ্বারা, এর বেশি কিছু নয়। তাই তো।  কিন্তু, এর মানে এই নয় যে, সেই চার দেওয়ালের মধ্যে সকলেই ভালো বা আপন হয়ে ছিল বা আছে সত্যিকারে, কিংবা আপন হয়ে থাকবে চিরদিন।  স্নেহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, এই তিনটি শব্দ নিয়ত নানা ভাবে মুগ্ধতায় ঘোর হয়ে থাকে এখানে। কিন্তু, বাস্তবের ফলাফলে এর উল্টো হয় প্রায় ক্ষেত্রে। তাই যদি না থাকতো, তাহলে সংসারে এত জটিলতা কেন। আসলে সতর্ক থাকা ও প্রতি মূহুর্তে সব কিছু বিচার করার ক্ষমতা না থাকলে বুদ্ধি ঢুকে পড়ে অজ্ঞতাময় আবেগে, তখন আসে নানা মাত্রায় নির্বুদ্ধিতা, ও তারপর পরপর বিপন্নতা।  তারপর নানা বিপন্নতা থেকে বেরুবার চেষ্টা করতে গিয়ে সঠিক পথ নিতে বারবার ভুল করায় আরো-আরো বিপন্ন হবার দিকে ধাবিত হওয়া। এইভাবে একজন সৎ মানসিকতার মানুষ পরপর শেষ হতে থাকে, আবার অনেক সৎ মানসিকতার মানুষ নানা কায়দাবাজ লোকের চালাকিতে ঢুকে পড়ে অসৎ হয়ে যায়।  শিশু, অভিভাবক, নারী, পুরুষ,  সবার ক্ষেত্রে এই কাহিনী এক রকম ভাবে ঘোরাফেরা করে। এই ভাবে সভ্যতা বিপন্ন হচ্ছে বারবার, যে-বিপন্নতা শুরু হয় চার দেওয়ালের সংসার থেকে। এটা কি আমরা ভেবে দেখেছি?  বিপন্নতার উৎস কোথায় না খুঁজে কেবল বিপন্নতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি নানা ভাবে, আর সেই চেষ্টাগুলি হয় সব পন্ডশ্রম। এর ফলে সমাজ ও সভ্যতা বিপন্ন হচ্ছে পরপর, যদিও প্রথা মাপিক শিক্ষার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সংখ্যায় বেড়ে যাচ্ছে পরপর এবং ঘরে-ঘরে উচ্চ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানুষের ও বাকি সব জীব ও প্রকৃতির বাঁচবার নিরাপত্তা কমছে। তাহলে প্রচলিত শিক্ষা ব্যাবস্থা,  সমাজ ব্যাবস্থা, শাশন ব্যাবস্থা ও আমাদের আচরন ভুলে ভরা। তাহলে এদের বিপরীতে যে-শিক্ষা ব্যাবস্থা এসেছে সেটাই অপেক্ষাকৃত সঠিক হয়ে মর্যাদা পাবার দাবী রাখে।
মুক্ত চিন্তার শিক্ষা এইসব হাজারো বিপন্নতা থেকে নিজেকে ও সমাজকে বের করে আনতে শেখায়। এই শিক্ষা কাউকে গালি পাড়তে শিখায় না, বরং স্থির হয়ে ভাবতে শেখায়,  কারোর কথায় অন্ধ বিশ্বাস না করে নিজের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়, এবং সঠিক সিদ্ধান্তে নির্ভিক ভাবে এগিয়ে যেতে শেখায়। এবার এই গুণগুলি কে কতোটা আয়ত্ব করবে পরপর, সেটা তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে।
যুক্তিহীন ভাবে কাউকে বন্ধু ভেবে নেওয়া বা শত্রু ভেবে নেওয়া,  কোনোটাকেই মুক্ত চিন্তার শিক্ষা পদ্ধতি সায় দেয় না। আসলে,  আমাদের ব্যাক্তি-জীবনের ও সমাজ জীবনের ও রাষ্ট্রীয় জীবনের মূল দুশমন হোলো আমাদের চিন্তা, বুদ্ধি, সঠিক জ্ঞান ও সৎ সাহসের বিকাশ না হওয়া। সেই বিকাশ যদি হোতো, , তাহলে কি আমরা কলেজ -বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির নামে বন্ধুরা মারদাংগা করে কাটাতাম? আবার,  এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে রেসারেসি দাংগাকে শিক্ষার অন্তর্ভক্তি করা হয়েছে, এবং ফাঁকি দিয়ে পাস, বেঠিক পথে অনেক সময় নানা সম্মানীয় ডিগ্রি লাভ ও যেকোনো অসৎ কৌশলে টাকা আয়ের পথ নেবার দিক নির্নয় করে দেওয়া হয়। তবুও এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আমরা বলতে বাধ্য হই মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। আবার এদের মধ্যেও ভালো, মাঝারি ও খারাপ মাপের শিক্ষার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ভেদাভেদ আছে, কেবল শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের চিন্তার ও উদ্দেশ্যের কোনো ভেদাভেদ দেখি না। মানে এঁরা অযোগ্য নন, বরং নিজেদের সঠিক যোগ্যতাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে বাধ্য হন, আর সেই অভ্যেস করেছেন চলে আসা নিয়মের আধীনে শিক্ষা দিয়ে ও শিক্ষা নিয়ে। অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার মারামারি দাংগা না থাকলেও সেখানে শান্তির শিক্ষার নামে মঠ-জীবনের গন্ডি বেঁধে দেওয়া হয়, তাই সেখানে ছাত্রছাত্রীদের একমুখি কোনো বিশ্বাস ও পদ্ধতি শেখানো হয়, আর তারা শান্তি প্রেমি নাগরিক হবার নামে হয়ে থাকে বুদ্ধিজড় মানব শরীর। কারন, তাদের মধ্যে মুক্ত চিন্তা, মুক্ত সৃষ্টিশিলতা,  সমাজের মধ্যে নানা অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করার সাহস — এসব ঘুমিয়ে যায়। খুব কম সংখ্যার মানুষ কোনো এক অজ্ঞাত নিয়মে বেরিয়ে আসে এইসব জড়ত্ব থেকে ও নিজের নিয়মে চলতে থাকে। সেই সংখ্যা এত কম যে দেশ, বিশ্ব বারবার বিপন্নতায় শেষ হচ্ছে।  এবং আমারা নিরব থেকে হাসি মুখে সেগুলি সহ্য করছি,  আগামির ছবিটা দেখতে-দেখতে।
জীবনের গভীর শিক্ষা হোলো চক্রান্ত বুঝতে শেখা, ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে খুব সুক্ষ্ম ভাবে লড়ে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।  আর এটাই শেখানো হয় না প্রচলিত শিক্ষা ব্যাবস্থায়। সেটা এদেশে হোক বা বিদেশে হোক। এই আসল সত্যটা আমাদের চোখ এড়িয়ে রাখা হয় যে-পদ্ধতিতে,  সেটাই আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যাবস্থা– হাজার-হাজার বছর ধরে স্কুল, কলেজ শিক্ষা ও পারিবারিক শিক্ষা। তাই এত বিপন্নতা আসে।
মুক্ত চিন্তার শিক্ষা এইসব সর্বনাসকে নিজের নিয়মে চিনতে শেখায়, এবং সঠিক অবাস্থান নিতে শেখায়।এই প্রকরনে একটা গতিশীলতা সমাজে ঢুকে গেলে সেই স্বতস্ফুর্ত ধারায় আমাদের জীবন চলবে ও পরপর মানুষের মধ্যে সুস্থতা আসবে।
কোনো একটি প্রতিষ্ঠান সারা দেশের দায় নিতে পারে না। সে নিতে পারে তার মত আয়তনের কাজের দায়বদ্ধতা।
এবার কেউ বলতে পারেন,  এই প্রতিষ্ঠান থেকে বা এর সাথে যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব পুরষ্কার দেওয়া হয় বা হবে সেই পুরষ্কারের ফলকের মূল্য কত দামী।
আমার সহজ উত্তর হোলো, এটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দিচ্ছে, সোনা ও রত্ন ব্যাবসায়ী সমিতি থেকে নয়।
এবার কেউ বলবেন, ” এই পুরষ্কারের আর্থিক মূল্য কত?”
এর উত্তরে বলি,  ১৯০ বছর ধরে বৃটিশ শাশন ভারত থেকে যত সম্পদ লুট করে তাদের দেশে নিয়ে গেছে সেই মুল্য।
আসলে আমরা কোনো কিছুর ভিতরের গুরুত্ব দেখি না, কারন, ভিতরে দেখার চোখ তৈরি করেনা আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ধারা।
কেউ বলবেন,  তাহলে সমর্পিতার প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান কি “বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন” বা UGC এর অধীনে?
তার উত্তরে বলি,  শিক্ষা হয় শিক্ষার অধীনে, UGC এর আধীনে নয়।আসলে আমরা কিছু বিধিসম্মত কথা শোনা ও সেইগুলি আউড়ে যাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠি, সেটাকেই বলি শিক্ষার প্রমান। হায়রে দেশ! হায় রে সভ্যতা!
পাশাপাশি আমার প্রশ্ন, আচ্ছা UGC কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন করলে সেটাই পাবে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা। তাহলে,  প্রশ্ন, UGC-কে কে দিয়েছে কাউকে শিক্ষায় অনুমোদন দেবার অধিকার? উত্তরে বলবেন, ” এটা দিয়েছে কেন্দ্রিয় শিক্ষা দপ্তর।”
এবার প্রশ্ন, ” কেন্দ্রিয় শিক্ষা দপ্তরকে কে অধিকার দিলো এই অনুমতি দেবার?” উত্তর দেবেন, ” প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি বা সুপ্রিমকোর্ট -এর প্রধান বিচারপতি! “
এবার আমার প্রশ্ন, ” এঁরা কার দ্বারা এই অনুমোদন দেবার অধিকার পেলেন,  কেন,  কীভাবে?”
আপনি বলবেন, ” সংবিধান দিয়েছে এই অধিকার!”
এবার আমার প্রশ্ন, “সংবিধানকে কে এই অধিকার দিলো?”
আপনি উত্তর বলবেন, ” সংবিধান প্রনেতাগন।”
এবার আমার প্রশ্ন,  এই সংবিধান প্রনেতাগনকে কে নির্বাচিত করেছিলেন সংবিধান রচনার গঠন করার জন্য?
আপনি বলবেন, ভারতের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু।
তাহলে  আসল জিনিস একজন ব্যাক্তি। বিরাট কমিশম, মন্ত্রিপরিষদ,  আদালত, UGC, এগুলি সব ফাঁপানো কান্ড।
সেই ফাঁপানো কান্ড ” নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ ” শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই। বিরাট আয়োতনে ছড়ানো পদগুলি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই। সোজা নাককে উলটো করে দেখানোর দরকার নেই এখানে, তাই কি এর থেকে শিক্ষা ও সম্মান UGC-এর নিচে, এটাই কি আমরা মেনে নেবো? কেন? কাদের যুক্তিতে,  কোন আইনের জন্য?
এবার সকলেই চুপ করে গেছেন। এবার স্বীকার করবেন, আসল জিনিস হোলো সঠিক বিচার ও একজন ব্যাক্তির পরিকল্পনা, এবং তাঁকে কাজে সহায়তা করেন সম পর্যায়ের আরো কিছু সংখ্যক মেধা সম্পন্ন ব্যাক্তি। এবং তাই এই পুরষ্কারের সম্মান UGC থেকে কম নয়।
আশা করি,  এবার আপনাদের অনেক ভ্রম কেটেছে। এইটাই মুক্ত চিন্তার শিক্ষা। ভুল ভাবনা কোথায় লুকিয়ে আছে খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দাও।
বাড়িতে কোনো রাসায়নিক না মিশিয়ে খবারটা রান্না করে আপনাকে সহজে  খেতে দিলে সেটার মূল্য কম। কিন্তু সেই খাবার রাসায়নিক মিশিয়ে বানিয়ে রঙিন প্যাকেটে ঢুকিয়ে বাজারে পাঁচগুন মূল্যে বিক্রয় হলে সেটা হয় দামি খাবার।
প্রচলিত বা তথাকথিত শিক্ষা ব্যাবস্থা এই বদ স্বভাব বানিয়ে দিয়েছে। তাই আমরা ভ্রমে আছি। সেই কারনে উপাদেয় দ্রব্যকে ভাবি তুচ্ছ, ক্ষতিকারক দ্রব্যকে ভাবি উপকারি।
এগুলি আমার ব্যাক্তিগত বিশ্লেষন। একটু ভেবে দেখুন সত্য বলছি কিনা।
যাইহোক, নানা বিকৃত পরিস্থিতিতে বিকৃত হয়ে থাকা এই সমাজে সমর্পিতা কাজ করছেন খুব দুরুহ পরিস্থিতির মধ্যে। এগিয়ে যাচ্ছেন এইভাবে।
সারা দেশ ও বিশ্বের দায়িত্ব সম্পন্ন মানসিকতার মানুষদের সহযোগীতা কাম্য। তাঁর সফলতা আমাদের সমাজ জীবনের সফলতা, এটা কি সত্য নয়!
এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের Student বলা হয় না। বলা হয় নাইট (knight)। যার মানে হোলো চিন্তার ও মুক্ত ভাবনার নির্ভিক সৈনিক।
এই বিশ্ব-মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের “সবুজ সেনা সম্মান ” -এর অন্তর্নিহিত মানে  কী, সেটা নিয়ে এত বিশ্লেষণ।
আগে বলেছি, এর ছাত্রছাত্রীদের বলা হয় নাইট (knight),  মানে মেধা যুক্ত সৎ সাহসী সৈনিক। সৈনিক মানে যৌবনের প্রতীক। তাহলে যে-প্রতিষ্ঠান দেয় ” সবুজ সেনা সম্মান ”  দেশে, বিদেশে নানা গুণীদের,  সেটা দেওয়া হচ্ছে যৌবনের উৎস থেকে যৌবনের পরিব্রাজকদের।
এতদিন আমরা জানতাম গুণী মানে বাদ্ধর্কের চিত্র, আর  ” নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ ” প্রমান করতে চায় গুণী মানে যৌবনের প্রতীক। এতো বিরাট চিন্তা যে-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেয় সেটা কি পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয় নয়?
এঁদের আরো অনেক ভাবনা আছে যে-গুলি বাস্তবে রূপায়িত হলে দেশে, সমাজে সুস্থ হাওয়া বইবে। সেগুলি বাস্তবে রূপায়িত হতে দরকার যে-পরিস্থিতি, সেগুলি কি আমরা সবাই মিলে এনে দিতে পারি না?
এই প্রশ্নটা নিজেদেরকে নিজেরা করার সময়ে আরো একটি জিজ্ঞাসার সমাধান করা  যাক।
স্কুল মানে ছোট ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষালয়,  এটা আমরা জেনে এসেছি। কিন্তু সেটাও ভুল জানা। ভুল জ্ঞান নিয়ে তো আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ধারা চলে আসছে, তা থেকে বেরোনোর ইচ্ছেই তো শিক্ষিত হতে চাওয়ার প্রথম ধাপ।
১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল প্রাইজ পাওয়া অমর্ত্য সেন যে-সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন ও করেছিলেন — সেগুলির মধ্যে ছিল লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স, দিল্লী স্কুল অব ইকনমিক্স। এগুলি কি প্রাথমিক স্কুল ছিল? নিশ্চয় ছিলনা। এগুলি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়।
যদিও প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষাই মূল শিক্ষা এবং এই শিক্ষাদান সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু আমাদের দেশে এই কঠিনতম কাজ যাঁরা করেন তাঁদের কম সম্মান দেওয়া হয়। তাই এই দেশ এতটা পিছিয়ে। এটা আমার মতামত। অনেকের সাথে নাও মিলতে পারে। দেশপ্রেমের নামে দেশের সর্বনাসগুলিকে যদি দেশের উন্নতি বলে স্বীকার করি তাহলে আমি দেশদ্রোহী, এবং যে-আইন আমায় চাপ দিয়ে এটা বলাবে বা করাবে — সেই আইন দেশের মাঝে সবচেয়ে দেশদ্রোহী।
যাইহোক, জেনারেল সমর্পিতার প্রতিষ্ঠিত স্কুল কেন বিশ্বের একটি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, সেটা নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে পেরেছি।
কেউ আমার এই যুক্তিগুলিকে মিথ্যা প্রমান করলে আমি ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা পুরস্কৃত করব। আমি যাকিছু বিশেষ কথা বলি সেটা বাজি রেখে বলি। যাতে অসৎ প্রতিপক্ষ আমার মতামতকে পাগলামো বলে বা আবেগ বলতে না পারেন।  কারন সেটা বললেই বাকিরা আমার প্রতিপক্ষদেরকে বলবে, ” ঋদেনদিক মিত্রো যদি এই বিষয়ে ভুল বলছে — সেটা প্রমান করে কোনো পত্রিকায় প্রকাশ করে প্রমান দেখিয়ে বাজির টাকা নিয়ে এসো। “
এটিকে কেউ নোংরা challenge ভাববেন না। বরং নিজের উপলব্ধ জ্ঞানকে বিশেষ ক্ষেত্রে এইভাবে সম্মান না দিলে নিজেকে জ্ঞানের কাছে প্রতারক মনে হয়। নিজের জ্ঞানের কাছে নিজে প্রতারক প্রমানিত হলে, এর চেয়ে বড় অশান্তি ও দুঃখ জীবনে আর কিছু নেই। কিন্তু প্রতিপক্ষ আমার এই যুক্তিগুলিকে ভুল প্রমান করতে এসে হেরে গেলে তখন তাঁরাও প্রত্যেকজন আমাকে একই টাকা দেবেন। জ্ঞান নিয়ে যে বাজি লড়ে সেই শিক্ষিত, তাস,  পাশা নিয়ে বা ক্যাসিনোতে যারা জুয়া খেলে তারা শিক্ষিত নয়।  এই সহজ সত্যকে আমরা উপলব্ধি করলেই আমাদের দেহ,মন হবে সুস্থ ও নিরুপদ্রব। কারন, তখন আমরা হবো শিক্ষিত  নিজেদের ভিতরের বিশ্বাসে।
এইবার যখন লেখাটা শেষ করতে যাচ্ছি, তখন কোনো তার্কিক পাঠক বন্ধু বলবেন, ” লেখক,  একটা প্রশ্নের কিছু উত্তর না দিয়ে যেও না। নবাব সিরাজ নাকি নানা ভাবে চাপ সৃষ্টি করে প্রজাদের থেকে আয়কর আদায় করতেন। এই নিয়ে অনেক দুঃখের তথ্য আমরা শুনেছি। “
এর উত্তরে আমি বলবো, এই বিষয়ে কারা কী ভাবে কতটা শুনেছেন জানিনা, কিন্তু কয়েকটি কথা বলবো।
আমি পরপর বলে যাই। আলাদা-আলাদা করে বুঝিয়ে বলছি।
(১) কোন রাজা প্রজাকে আদর করে চুমু খেয়ে আয়কর আদায় করতেন, ইতিহাসে দেখান।
(২)  আপাতত আমাদের দেশিয় প্রজা চরিত্র কি চাপ ছাড়া আয়কর দেয়? আচ্ছা, আমরা পকেটে টাকা থাকা সত্বেও সুযোগ পেলেই ট্রেনের টিকিট না কিনে যাতায়ত করি কেন? কেউ অনেক বার ধরা পড়েও জরিমানা দিয়েছি, কেউ জেলেও গিয়েছি, তবুও এই বদভ্যেস শুধরায় নি কেনো?
(৩)  যাদের অনেক আয়, তারা বিলাসের জন্য টাকা নষ্ট করে, পরের ক্ষতি করার জন্য টাকা খরচ করে, কিন্তু সরকারকে আয়কর দেবার সময় চ্যাটার্ড একাউন্টেট দিয়ে কোটি-কোটি টাকা আয়কর ফাঁকি দেয় কেনো।
এটা হোলো খুব সচ্ছল পরিবারগুলির কাহিনি,  তার নিচের অর্থনৈতিক পরিবারগুলিও আর এক রকম।  ২০২০ সালে যখন করোনা অতিমারির সময়ে মানুষের কাজ বন্ধ। বেসরকারি চাকুরেজীবিরা, বা স্বনির্ভর কাজের লোকেরা মজলিশ করে খেয়ে সব ঊড়িয়ে দিয়ে ক্লাবে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিয়ে এসে আবার সেই খাবার নিয়েও মজলিস করে খেতো
সঞ্চয় রেখে বাঁচতে চায় নি এরা।
আবার,  ধনীরাও বিনে পয়সায় গরীবের খাবার কেড়ে নিয়ে খেয়েছে,  লাইনে দাঁড়িয়ে গরিবের সাথে।
তাহলে, আমাদের দেশের প্রজার চরিত্র কেমন! তাই,  চাপ দিয়ে বা নানা ভাবে ভয় দেখিয়ে নবাব, সম্রাটরা প্রজাদের থেকে আয়কর নিতেন। তবে কোন শাশক কী কারনে সেই কঠোরতা কতটা দেখিয়েছেন, সেই বিচারের প্রয়োজন ও প্রসংগ আলাদা।
মানি, এর ফলে অনেক দায়িত্বশীল সৎ নাগরিক নানা বিপন্নতায় কর দিতে না পেরে শাস্তি পেত, যেমনটা কর দিতে সমর্থ ফাঁকিবাজ নাগরিকগন শাস্তি পেতো।
এখানে জিজ্ঞাসা  আসতে পারে, কর দিতে না পারা সৎ নাগরিকদের বেছে শাস্তি মুকুব করার কোনো ব্যাবস্থা করা হোতো না কেনো?
তাহলে সেটা কত খানি সম্ভব, এবং এই যুগেও কতটা সম্ভব সেটা দেখা যাক।
ছোট একটা উদাহারন দিয়ে বলছি। এই যুগে একজন গরিব মানুষ সরকার থেকে ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটা বাড়ি বানালো। আর একজন ভালো আয়শীল নাগরিকও তাই করলো।
দেখা গেলো, কয়েক বছর পর দুই জনের প্রত্যেকের ঋণের টাকা সুদে দ্বিগুন হয়েছে। গরিব লোকটি আয়ের পথ না পেয়ে ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারেনি, আয়শীল লোকটি বিলাসে খরচ করার জন্য ব্যাংকের ঋণ ইচ্ছে করে শোধ করেনি। কিন্তু,  তখন ব্যাংক থেকে প্রতিনিধিরা সংগে পুলিস নিয়ে এসে দুজনের সম্পত্তি দখল করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে দুটো বাড়ি নিলামে বিক্রি করে টাকা তুলে নেবে।
এই যুগে কি কোনো ব্যাবস্থা আছে যেটা দিয়ে গরিব মানুষটাকে সত্যি গরিব অসহায় বলে প্রমান করে রেহাই দেওয়া যায়?  নেই। কারন, নিচ থেকেই প্রায় প্রজারা অসৎ,  কেউ কাউকে সত্য দিয়ে সহায়তা করে না। যারা সৎ প্রজা তারা আবার ভয়ে জড়সড়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা পালন করেন। তাই রাজার তরফ থেকে ইচ্ছে থাকলেও সঠিক নিয়মে কিছু করা যায় না। আবার সব রাজ চরিত্র এক রকম নয়। তাই সব দিক থেকে সৎ স্বভাবের নাগরিকগন বিপন্ন হয় যুগে-যুগে  আগ্রাসি মানসিকতার নাগরিকদের দ্বারা। সেই আগ্রাসি মানসিকতার নাগরিক যখন রাজা হন বা রানী হন তখন তিনি রাজা বা রানী হিসেবে অত্যাচারি নন, তিনি আগ্রাসি চরিত্রের প্রজা হিসেবেই অত্যাচারি। এর মূল কারন,  প্রাচীন  যুগ থেকে শিক্ষা ব্যাবস্থা ছিল না সঠিক পদ্ধতির। অনেক জ্ঞানের পুস্তক রচনা করতেন জ্ঞানি মানুষেরা, কিন্তু, জ্ঞানকে জনগনের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে পরিনত নাগরিক করে তোলার কোনো পরিকাঠামো ছিলো না। গুরু-গৃহে পন্ডিত তৈরি করা হোতো, কিন্তু ভুল বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সমাজ বদলে দেবার জন্য  ক্ষিপ্র বুদ্ধি সম্পন্ন সৎ সাহসি ছাত্রছাত্রী গড়ে তোলা হয় নি। ঠিক এই কারনেই আগ্রাসি চরিত্রের নাগরিক ও  আগ্রাসি চরিত্রের শাশক ধারাবাহিক ভাবে বিপন্ন করে আসছে সমাজ ও দেশ। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত অনেক প্রাচীন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সমাজের কোনো উন্নতি আসেনি। যদিও এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি দুজন ছাত্রের জন্য একজন শিক্ষক থাকতো। বহু রকম জ্ঞানে তাঁরা ছিলেন পন্ডিত। বহু জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে কৃতি হয়ে বেরুতো হাজার-হাজার ছাত্র প্রতি বছর। তাঁরা আসতেন নানা দেশ থেকে। তাহলে  সারা পৃথিবীতে এত অবিচার, অশিক্ষা,  ঊপদ্রব, জ্ঞানীর কাপুরুষতা কেন?
তখন জনসংখ্যা ছিল অতি সামান্য,  সেই তুলনায় প্রতি বছর হাজার-হাজার ছাত্র বহু বিদ্যায় মহাপন্ডিত হয়ে বেরুতো, কিন্তু পৃথিবী ব্যাপি এত অবিচারের উপদ্রব ছিলো কেনো?
কয়েকজন জ্ঞানী সাহসী দেশে ও বিশ্বে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়, আর সেখানে যদি প্রতি বছর হাজার-হাজার ছাত্র বহু বিদ্যায় কৃতকার্য হয়ে বেরোয়, তাহলে তাদের দ্বারা সমাজ আলোকিত হয় নি কেনো? কেন তাঁরা থাকতে অত্যাচারি লোক শাশন করতো দেশ তথা পৃথিবী?
তাহলে সেই শিক্ষার মধ্যে ছিলো না পরিনত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পদ্ধতি। যে-শিক্ষায় সুক্ষ্মদর্শীতা ও সৎ সাহসিকতা গড়ে ওঠে না, সেটা অত্যাচারি শাশকের অধীনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দাসত্ব করার জন্য বিদ্যা অর্জন। তাহলে আমরা কোন শিক্ষার ইতিহাস নিয়ে অহংকার করে এসেছি?
এবার আসছি সেই আয়করের বিষয়ে। সঠিকভাবে প্রজার কর দেবার ক্ষমতা বিচার না করে সৎ ও ফাঁকিবাজ — দুই রকম প্রজার প্রতি সমান আচরন করা হয়েছে। এটা নিন্দনীয়।
এই আধুনিক যুগেও আমরা দিশাহারা এতটাই, তাহলে ওই যুগে যখন গরুর গাড়ি, পালকি, ঘোড়ার গাড়ি ও ঘোড়া ছিল যানবাহন,  এবং পথ ছিল কাদা,  ধুলা, এবং অনেক জংগল ভরা, জলেও ছিলনা উন্নত জলযান, ছিলনা ফোন, রেডিও, টিভি, ইন্টারনেট,  — সেই যুগে কি করে সৎ ও অসৎ প্রজা খুঁজে আয়কর ছাড় দেওয়া সম্ভব ছিলো?
(৪) তখন এক শ্রেনীর রাজ কর্মচারি ছিল, যাবা রাজার কাছে প্রজার বিরুদ্ধে ক্ষেপাতো, আবার প্রজার কাছে রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপাতো।আর এইসব নিয়ন্ত্রনে আনা যেত না। এখোনো কি এটা সম্ভব হয়, হয় না। তাহলে সেই পরিস্থিতিতেও নবাব সিরাজ ঢুকে পড়েছিলেন। এবং সেইমত তিনি হয়তো কখনো আচরন করতেন। ওই জায়গায় অন্য কেউ নবাব হলেও করতেন। বাধ্যতামুলক পরিস্থিতির শিকার ছিলেন তিনি। আর সেই যুগে এমন কোনো শিক্ষা ব্যাবস্থা ছিলনা, যেটা দিয়ে কোনো শাশক নিখুঁত হতে পারেন। এই আধুনিক যুগেও কি সেটি হওয়া সম্ভব হচ্ছে? সেটা হলে তো ভালোই, কিন্তু কোন পথে হবে?
(৫) কেউ বলতে পারেন,  ইতিহাসে লেখা আছে রাজা হর্ষবদ্ধন, রাজা শশাংক, এঁদের নিয়ে তো প্রজাপীড়ন করে কর নেবার কাহিনি শুনিনি।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ওই সময় ওই রাজাদের প্রজারা কি আলাদা চরিত্রের প্রজা ছিলো? সেই প্রজারা ওই রাজাদের আগের সময় অত্যাচারিত হতো, আবার ওই রাজাদের মৃত্যুর পরে অন্য রাজা আসার পর অত্যাচারিত হোতো, শুধু ওই রাজাদের সময় হোতো না? একটা দেশে ওই রকম কয়েকজন রাজার সময়ে লাখ-লাখ মহান প্রজা ও রাজকর্মচারি ছিল, যারা রাজাকে মুক্ত মনে সাহায্য করতো। তাহলে সেই দেশ আজ এই বিপন্নতায় কেনো? তাদের  মহৎ কাজের ধারা ও মহৎ স্বভাবের বংশধররা তো ধারাবাহিক ভাবে সারা দেশে বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়ে কোনোভাবেই  ত্রুটিময় শাশকদের ক্ষমতায় আসতে দেবে না,  এবং আগ্রাসি আচরনের নাগরিকদের আয়ত্বে এনে তাদের বদলে দেবে, বা বিকল্প কোনো পদ্ধতিতে সমস্যার সুরাহা করবে।
তা হয় নি কেনো? কারন, রাজা শশাংক, রাজা হর্ষবদ্ধনের সময়েও রাজ চরিত্র,  প্রজা চরিত্র ছিলো অন্য রাজাদের সময়ের মতন। কিন্তু,  ব্যাক্তিগতভাবে রাজা শশাংক,  রাজা হর্ষবদ্ধন ছিলেন অনেক সহজ শাশক। হতে পারে তখন বেশির ভাগ প্রজা দায়িত্ব নিয়ে কর দিত। কিন্তু, সেটা কীভাবে ঘটতো, সেটার বিজ্ঞান সম্মত কারন খুঁজে পাচ্ছি না।
কিন্তু, যদি ভেবেই নিই, মাত্র ওই কয়েকজন রাজা দেশের নাগরিকদের সৎ ও দায়িত্ব সচেতন করে গড়েছিলেন, তাহলে সেই মানুষ গড়ার শিক্ষা পদ্ধতি কোথায় গেলো?
এটা তো সুন্দরবনের কোনো গ্রামের ঘরে কেউ কোনো আবিষ্কার করে রাখেনি যে আয়লা ঝড়ে ডুবে তলিয়ে গিয়ে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলো!
(৬) তবে ওই সময়ের কোনো-কোনো রাজাদের পরিস্থিতি হয় তো সহায় হয়েছিলো, তাই রাজ্যের পরিস্থিতি অনেক নরম ছিল, যেমন একই রুচির জনগোষ্টির বসবাস। একই ধর্মের জনগোষ্টির বসবাস। কিন্তু, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অধিকার টানাটানির যুদ্ধ চলতো। এটাকে সেই নরম মতির রাজারা সামাল দিতেন কী করে!
তাহলে কী করে বিশ্বাস করব যে, ওই রকম কয়েকজন রাজার সময়ে তাঁদের রাজ্য ছিলো সমস্যাহীন! আর সমস্যা থাকলে রাজা হবেন কঠোর। অসৎ রাজা হলে তিনি হবেন সৎ নাগরিকদের প্রতি কঠোর। সৎ  রাজা হলে তিনি হবেন অসৎ নাগরিকদের প্রতি কঠোর। তাহলে রাজার কঠোরতা সব সময়েই থাকবে যতদিন না রাজা ও প্রজার চরিত্র সমান রূপে মহান ও সাবধানি হয়।
যদি রাজা  হর্ষবদ্ধন, রাজা শশাংক,এঁদের রাজত্বকাল সমস্যাহীন হয়, তাহলে অন্য ভিন্ন চরিত্রের রাজার শাশন ঢুকে গেলো কী করে? সৎ ও সতর্ক প্রজারা তো সেটা হতেই দিতো না।
(৭) তাহলে,  সব কিছুর মূলে একটিই বিষয়,  সেটা হোলো, প্রজাদের  সঠিক ভাবে শিক্ষিত করা, —  তাহলে সেই প্রজাদের মধ্য থেকে কেউ রাজা হলে তিনি হবেন বিচক্ষন ও দরিদী ও সৎ সাহসী। আবার রাজা না হতে পারা বাকি নাগরিকরা সহজে মেনে চলবেন রাজার সৎভাবে রাজ্য চালানোর পদ্ধতি।
সেই জন্যই চাই মুক্ত চিন্তার শিক্ষা। যেটা মানুষের মহৎ ক্ষমতার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটাবে, তখন সমাজ, দেশ হবে স্বাভাবিক নিয়মেই স্বাভাবিক।
কেউ বলবেন, মুর্শিদাবাদে গ্রামে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,  এর প্রভাব ও গতি আর কতটা যেতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো কোথাও যায় না। শিক্ষা যায় দেশ থেকে দেশে,  একটি ছোট কুটির থেকে কোটি-কোটি ঘরে। তাই গ্রিসের এরিস্টটল ও সক্রেটিসকে আমরা জানি, আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে তাঁরা গ্রিসে জন্মগ্রহন করেও তাঁরা মুছে যান নি, সারা পৃথিবী ব্যাপি তাঁদের চিন্তা ও জ্ঞান ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর ঘরে-ঘরে। আর তাঁদের জীবনের অনেক করুণ কাহিনি শুনে আমরা আজো নীরব হয়ে যাই।
তেমনি অনেক নীরবতা থেকে জেগে ঊঠে আমরা দেখতে পাচ্ছি আলো,  সকালবেলা গাছের পাতায় খেলছে রোদের ঝিলমিল। সে-আলোয় আমরা স্নান করছি।
আমরা যে এখন গাছপাতা থেকে বেরিয়ে আসা  ঝিলমিল  আলোয় স্নান করছি,  তার প্রমান পাই, যখন অর্চনা নামের এক দিদি চারদেওয়ালর ক্ষুদ্র সাংসারিক বন্দীত্বের মুগ্ধতায় সারাক্ষন না থেকে ২০০৯ সাল থেকে বেরিয়ে এসে হীরাঝিল সংলগ্ন এলাকায় শিশুদের নিয়ে একটি ইস্কুল পরিচালনা করেন। কিন্তু, ঘটনাক্রমে ২০২০ করোনা অতিমারির সময়ে তা বন্ধ হয়। ২০২১ সালেও বেশিটাই এই আতংকে কেটেছে। জীবনের প্রতি তখোনো আস্থা আসেনি মানুষের।তারপর একটা সময়ে শুরু হোলো হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলনের তোড়জোড়। তারপর ২০২১ সালে ৫ ডিসেম্বরে হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলনে অনেক মানুষ যখন সারি-সারি দু-চাকার গাড়ি,ও তিন চাকার গাড়িতে উঠে মিছিল নিয়ে লালবাগ থেকে ছুটে আসতে-আসতে হীরাঝিলে জড়ো হন, সেখানেই ঘটনাক্রমে পরিচয় হয় সমর্পিতার সাথে অর্চনার। সবার কন্ঠে মিলিত ধ্বনি, সমর্পিতার সৃষ্টি সেই উদ্দীপনার ধ্বনি — আকাশ বাতাস জেগে ওঠা ধ্বনি —

 ইতিহাসে গরমিল,
    জেগে ওঠো হীরাঝিল।
   হীরাঝিল, হীরাঝিল।
চমকে গেলাম, ঘুমিয়ে থাকা বাঙালী এত জাগতে পারে!

করোনা আতিমারির আতংক যখন যায়নি, আতংকের রেশ চলছে তখনও,  সেই সময়েও হীরাঝিল আন্দোলনে সন্তানদের এই বিপ্লবে পাঠিয়ে দিলেন অভিভাবকেরা। নিজেরাও এলেন যোদ্ধার সাহস নিয়ে। ইতিহাসের অনুভুতি তাঁদের  এতটাই মুগ্ধ করেছে।
ইতিহাসের প্রতি,  জ্ঞানের প্রতি যাঁদের এতো ভালোবাসা তাঁরাই তো সভ্যতার আদর্শ।
অন্যদিকে, এইসময় বিপ্লবের ব্যাস্ততা কিছুটা হাল্কা হলে তখন পরিচয় ও আলোচনার মধ্যে অর্চনা তাঁর স্বপ্নের কথা জানান সমর্পিতাকে। সমর্পিতা রোমাঞ্চিত হলেন এই সম ভাবনার এক যোদ্ধাকে পেয়ে। অর্চনার সম্মতিতেই  সমর্পিতা নিজের  ” নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ” এর শাখা হিসেবে অর্চনার স্কুলকে সাথে নিয়ে নিলেন।এবং সেটি শুরু হোলো এবার একদম হীরাঝিল অরন্য বাগানের ভিতরে।
নাম হোলো, ” হীরাঝিল আলোক কেন্দ্র”। সত্যি তো, এখান থেকেও বেরুবে আলোর শিশুরা সারি-সারি।
এদিকে হীরাঝিলে গাছের গুড়িগুলোতে চুন লাগিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিপ্লবি বন্ধুরা পরিস্কার করেছে জংগলের নোংরা। চুন লাগানো গাছে রোদ লেগে  ঝিকমিক করছে। মাটি পরিষ্কার হয়েছে, ঘাসও পরিস্কার হয়েছে। এরাও হাসছে খিলখিল করে। ঘাস, পাতা, পোকামাকড়, বেজি, ইন্দুর, পাখি, সকলের শরীরে আজ হাসি।
কারন, মহৎ অধিকাকের আন্দোলন যেখানে ছুটে আসে সেখানে আর থাকতে পারেনা কোনো দুষন।পুস্তক যেখানে রাজত্ব করে সেখানে থাকে না কোনো দুঃখ। থাকে না হতাসা।  থাকে শুধু এগিয়ে যাবার খোলা পথ। তার নাম জয়।
জীবন তখনই সুখি,  যখন বলতে পারি,  কিছু ভালো কাজ করেছি তো এই জীবনে। কারন, আর বাকি সব কাজ প্রতারনা, কোনোটা নিজেকে প্রতারনা,  কোনোটা অন্যকে প্রতারনা।
এসো,  তাহলে আরো কিছু ভালো কাজ করে নিই।
আমার মত তুচ্ছ মনের মানুষেরা চায় নাম, যস, টাকা, অনেক টাকা আর প্রতিপত্তি।
আর ওঁরা চান শুধু রোদে,  ঝড়ে, বৃষ্টিতে জগতের জন্য নানা কাজ করে যেতে। তাঁরা বলেন, কাজ করতে চাওয়ার সামর্থ হোলো শ্রেষ্ঠ পাওয়া।
আমার মত মানুষেরা হিসেবে মেলাতে পারিনা— এঁরা কেমন!  শুধু ওঁদের দিকে তাকালেই চোখ ভিজে যায়।
———————————————-
  [ রচনা – ২৮-৩১ আগষ্ট ২০২২ ]
লেখক পরিচিতি :
ঋদেনদিক মিত্রো (  Ridendick Mitro) ,  কলকাতা, ভারত, পেশায় ইংরেজী ও বাংলাভাষায় আলাদাভাবে দুটি ভাষায় কবি-উপন্যাসিক-গীতিকার-কলামনিষ্ট। নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক ইতিহাস নিয়ে অজশ্র কবিতা,  গান,  দুটি ভাষায় রচনা করেছেন। এবং এই বিষয় নিয়ে ১০ ০০০ ( দশ হাজার)  লাইনের মহাকাব্য রচনা করেছেন, কলকাতার একটি দায়িত্বশীল প্রকাশনি Book Bengal পুব্লিশের ( মালিক – Somindra Kumar)  থেকে বেরুচ্ছে।
” নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ  / আমাদের তুমি গর্ব,  বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ” সংগীতটি সমর্পিতার ( Samarpita ) সুরে ও কন্ঠে দেশে-বিদেশে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালে শেষের দিকে এটি  নির্বাচিত হয়। নবাবের নামে স্কুলে ও তাঁর কবরের প্রার্থনা সংগীত হিসেবে গৃহীত, ও এই ইতিহাস মুখি নানা অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়। ২০২২, ২৩ জুন,  পলাসির যুদ্ধের ২৬৫ তম দিবসে হীরাঝিলে শহীদ বেদীর উন্মোচনে বাংলাদেশ থেকে আসা নবাব সিরাজের নবম বংশধর সৈয়দা মাহামুদা এবং নবাব মিরজাফরের বংশধর  ” নবাব অব মুর্শিদাবাদ ” – এর ভাই ছোটে নবাব রেজা আলি মির্জা এই সংগীতে কন্ঠ মেলান। আমরা অনেকে জানিনা যে, এখোনো ভারত সরকার দ্বারা স্বীকৃত  নবাব হিসেবে সম্মানীত আছেন এই পরিবার এবং এঁরা নানা সামাজিক কাজে ব্যাস্ত থাকেন। প্রাসাদেই থাকেন। রেজা আলি মির্জা একজন দক্ষ গজল গায়ক, কবি। অন্য দিকে ২০২২ সালে আগষ্ট মাসের শেষের  দিকে ঋদেনদিকের ইংংরেজী গান  ” Save Heerajhjl” ( Save Heerajhil, It’s a good will)   হীরাঝিল বাঁচাও বিপ্লবের প্রতীকী গান হিসেবে গৃহীত হয়।৷ World Music Melodies – youtube channel. এটি গেয়েছেন সিনেমার প্লে ব্যাক গায়িকা শুভলক্ষী দে (Subhalaxmi Dey)। সুর -কুমার চঞ্চল (Kumar Chanchal) । ঋদেনদিক তাঁর লেখনীর গুণে নবাব সিরাজ কেন্দ্রিক আন্দোলনে প্রতীকী কবি বা Brand Poet হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই সংবাদ আমাদের কাছে খুব গর্বের। কারন,  নবাব সিরাজ হলেন অখন্ড ভারতের ইতিহাসের নায়ক। তাঁর জীবন নিয়ে নানা রকমের সত্যি-মিথ্যা গল্ল যাই থাক, তাঁর অবস্থান আমাদের মনে উজ্জ্বল। ভারতের ইতিহাসেও প্রধান গুরুত্ব পায়।
যদিও ঋদেনদিককে এই পর্যায়ে আসতে নানা ভাবে উৎসাহিত ও দায়িত্বশীল সহায়তা করেছেন গবেষক, সাংবাদিক তথা একজন আন্তর্জাতিক ইউটুবার Manas Bangla -Youtube channel এর Manas Sinha, এবং Samarpita. সমর্পিতা হলেন তিনি যাঁকে নিয়ে উপরের নিবন্ধ গদ্যটি লেখা।  এবং হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলনের বিপ্লবীগন। এই আন্দোলনের ভিডিও YouTube — এ দেখে রোমাঞ্চিত হয়ে কবি লেখেন দশ হাজার লাইনের মহাকাব্য, ও  ” Save Heerajhil ” সংগীত। মহাকাব্যটি যখন আট হাজার লাইন লেখা হয় তখন মুর্শিদাবাদে ” নবারুন ” — একটি অতিপরিচিত মূদ্রিত পত্রিকার সম্পাদক কবি শীষ মহাম্মদ ” বুলবুলের বৈৈঠকখানা” নামের একটি বিখ্যাত PDF পত্রিকার সম্পাদককে জানিয়ে কবির ছবি সহ একটি বড় সংবাদ করান। পরে এই শীষ বাবু কবিকে উৎসাহিত করে এটা দশ হাজার লাইনে শেষ করান। সেই সংবাদে আছে এই মহাকাব্য লেখার চমৎকার কাহিনী।কী করে একজন অপরিচিতা, ফোনেও পরিচিত নয়, শুধু লেখায় পরিচিত ” Potrika Nabarun ” WhatsApp group পত্রিকায় নারী কবি-সমালোচক অন্তরাক্ষীর উৎসাহে এই মহাকাব্য লেখার কাজে মানসিক শক্তি পেয়েছিলেন। সাহস দিয়েছেন আরো অনেকেই। এগুলি পারিপার্শিক তথ্য। এই সাহিত্যের সাথে যুক্ত।
হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলন নিয়ে জানুন ” হীরাঝিল বাঁচাও ” facebook-এ। ইতিহাস নিয়ে এমন আন্দোলন পৃথিবীতে আগে কোথাও হয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই।
সব লেখা সকলের কাছে যায় না বলেই,  এই জাতিয় সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই রকম foot note দিতে হয়।  তাই পাঠকগন এটিকে অতিরঞ্জিত ভাববেন না।
———————————————
 সম্পাদক — globalnewz.online

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *